এক্সপ্রেসে ট্রেনে চড়ে ঘুরতে যাচ্ছেন অনেক দূর,অথচ নেই শৌচাগার! তবে শুনুন গল্প৷ #SpecialArticle

অরুনাভ সেনঃ ভাবুন আপনি ট্রেনে সওয়ার হয়ে বেরিয়েছেন ভ্রমনে,বেশ লম্বা সফর,ট্রেনে থাকবেনও বেশ লম্বা সময়,মনটাও বেশ খুশি-খুশি ভাব৷ট্রেন ছাড়ার সময় যতই এগিয়ে আসছে,মনের উত্তেজনা,উদ্দীপনা দ্বিগুন হচ্ছে৷নতুন জায়গা,বইতে পড়েছেন,ছবিতে দেখেছেন,গুগলে চেক করাও কমপ্লিট৷অজানা,অচেনা স্থান,কিন্তু মনের উদ্দীপনাকে নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারছেন না৷বেশিরভাগ মানুষের অভিজ্ঞতাটা এমনই হয়৷এবং দেশের সিংহভাগ লোকের বেড়ানোর ক্ষেত্রে পছন্দ কিন্তু ট্রেন৷কারন যেতে যেতে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করার আনন্দটুকু বিমানে মেলে না৷যাই হোক যে কথায় আসা,সেটাই বরং একটু খুলে বলা যাক৷আপনি বেড়াতে বের হয়েছেন, কিন্তু সবার আগে পৌঁছতে যে হবে গন্তব্যে৷ তারপরেই দৃশ্যসুখ মিলবে৷কিন্তু এখন যদি ফ্লাশ ব্যাকে আপনাকে নিয়ে যাওয়া হয় ১৮৫০সালের আশপাশ সময়ে৷আঁতকে উঠছেন,ভাবছেন কেমন ছিল তখনকার ট্রেনের গতি,কামরাগুলোর অন্দরমহল কেমন ছিল,এয়ারকন্ডিশন ছিল না বুঝতেই পারছেন,তবু জানলাগুলো কতটা প্রশস্ত ছিল এসব চিন্তা হওয়া একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক নয়৷ইতিহাস ঘেঁটে সবাই জানেন ভারতে ট্রেন চলাচল শুরু হয়েছিল ১৮৫৩ সালে।কিন্তু তারপরেও দীর্ঘ সময় ট্রেনেই ছিল বৈষম্য৷ হ্যাঁ বৈষম্যই বলা উচিৎ,কারন যাত্রা শুরুর দীর্ঘ ৫৫ বছর ট্রেনগুলোতে সবার জন্য শৌচালয়ের কোনো ব্যবস্থা ছিল না।যথারীতি যা হওয়ার প্রকৃতির ডাকে দূরপাল্লার ট্রেনগুলোতে খুবই বিড়ম্বনার সন্মুখীন হতেন যাত্রীরা। ১৮৯১ সালে তৃতীয় শ্রেণির কামরায় শৌচাগার চালু হয়ে গেল, কিন্তু যে শ্রেনীতে সবচেয়ে বেশি মানুষ যাতয়াত করতেন সেই চতূর্থ শ্রেনীর কামরাগুলিতে কোনও শৌচাগার ছিল না৷বুঝুন কান্ড আপনি হয়ত চতূর্থ শ্রেনীতে ভ্রমন করছেন,প্রকৃতির ডাক এল,কি করবেন ভেবেই পাচ্ছে ন না নিশ্চয়ই? ব্রিটিশদের শাসনে ভারত,রেল কর্তারা সিংহভাগই ব্রিটিশ,তাঁরা যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য তৃতীয় শ্রেনীতে শৌচাগার চালু করলেও তুলমামূলক কম পয়সার চতূর্থ শ্রেনীর যাত্রীদের জন্য শৌচাগার চালুর কথা ভাবেন নি৷
বিষয়টা এমন বা ভাবনাটা তাদের এমনই ছিল,ওসব কম দুরত্বের যাত্রী,প্রকৃতির ডাক ঠিক সামলে নেবে!এখন বলতে ইচ্ছা করছে ভাগ্যিস ট্রেনে সফর করছিলেন অখিলচন্দ্র সেন৷সাল ১৯০৯-১০৷এই ভদ্রলোকটির কাছে সবার কৃতজ্ঞ থাকা উচিৎ৷কারন জানতে চাইছেন নিশ্চয়ই?শুনুন সেই কাহিনী৷যদি শ্বশুড় বাড়ি থেকে ফেরার পথে তিনি যদি প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে ট্রেন না মিস করতেন,বোধহয় মাথামোটা ব্রিটিশ রেলকর্তারা সবার জন্য রেল কামরায় শৌচাগারের ব্যবস্থা করতে হয়ত আরও বিলম্ব করতেন৷ গল্পটা সবার জানা,তবুও একটু উল্লেখ করতেই হবে৷শোনা যায় অখিলচন্দ্র সেনের সহধর্মিনী তাঁর পতিদেবকে বেশ যত্ন করে কাঁঠাল খেতে দিয়েছিলেন। পাকা কাঁঠাল বলে কথা! সহধর্মিনীর কথায় বলুন বা ভালবাসায় বলুন, একটু বেশিই কাঁঠাল নাকি খেয়ে ফেলেছিলেন অখিলবাবু৷অন্যায় নিশ্চয়ই কিছু করেন নি৷অর্ধেক আকাশের ভালবাসা মিশ্রিত অনুরোধকে উপেক্ষা করতেই বা পারেন একালের কোন পতিদেব? নিশ্চয়ই নয়৷অখিলচন্দ্র সেনও পারেন নি৷সবকিছুই ছিল একেবারে সঠিক৷পত্নীর ভালবাসায় কাঁঠাল না হয় একটু বেশি খাওয়া হয়েছে৷হতেই পারে৷স্বামী-স্ত্রীর অন্দরমহলের মামলা৷কেউ নাক গলাবে না৷কিন্তু বিপদ যে ছিল ঘাপটি মেরে!এতগুলো কাঁঠাল হজম করার সহ্যশক্তিতে ডাঁহা ফেল করলেন অখিলবাবু৷ছুটছে ট্রেন,ওদিকে প্রকৃতির ডাকে প্রায় বেসামাল তিনি৷ অথচ চতুর্থ শ্রেণির কামরায় নেই কোনো শৌচাগার। অগত্যা আহমেদপুর স্টেশনে ট্রেন থামতেই কামরা থেকে নেমে এক দৌড়ে চলে গেলেন স্টেশনের শৌচালয়ে৷স্বস্তি মিলল৷কিন্তু বাঁধল আরও বড় বিপত্তি৷ শৌচকর্ম তখন সমাপ্তির পথে,কিন্তু ট্রেনের গার্ড দিলেন ট্রেন ছাড়ার বাঁশি৷অখিলবাবু পড়লেন মহা সমস্যায়৷ পড়িমড়ি করে ছুটে শেষ চেষ্টা করলেন যদি ধরা যায় ট্রেনটি৷কিন্তু ভাগ্য বিরূপ৷ চোখের সামনে দিয়ে চলে গেল ট্রেন৷শোনা যায় দৌড়বীরের গতিতে ট্রেন ধরতে গিয়ে প্ল্যাটফর্মের মধ্যেই হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলেন অখিলচন্দ্র৷অথচ তাঁর ঐ অবস্থা অনেকের কৌতুকের কারন হল৷অপমানিত অখিলচন্দ্রের মনে তখন ক্ষোভের আগুন ধিকিকিকি জ্বলছে৷ ক্ষুব্ধ অখিলচন্দ্র বেশ কড়া মাপের চিঠি পাঠালেন সাহেবগঞ্জ ডিভিশনাল রেলওয়ে অফিসে।দাবি করলেন উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের৷শোনা যায় ব্যকরনগত ভাবে ভুল ইংরাজিতে লেখা সেই চিঠি কিন্তু রেল কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখেছিল৷ইনকয়ারি হল৷তারপর থেকে দূরপাল্লার ট্রেনে চতুর্থ শ্রেণির কামরাতেও চালু হল শৌচাগার।সব মিলিয়ে বলা যায় ভাগ্যিস সেদিন অখিলচন্দ্র প্রকৃতির ডাককে উপেক্ষা করতে পারেন নি,ভাগ্যিস তিনি মিস করেছিলেন ট্রেন, না হলে দুরপাল্লার ট্রেনে সব কামরায় শৌচাগার চালু করতে আরও কত বিলম্ব মাথামোটা ব্রিটিশ রেল কর্তাদের হত কে জানে!দিল্লির রেলওয়ে মিউজিয়ামে অখিলচন্দ্রের চিঠিটি কিন্তু এখনও আছে৷
Loading...

No comments

Theme images by caracterdesign. Powered by Blogger.