Header Ads

জননেতা থেকে রাষ্ট্রনায়ক : এক অটল ব্যক্তিত্বের নাম অটল বিহারী বাজপেয়ী।



নজরবন্দি ব্যুরো: প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ীকে নিয়ে কলম ধরলেন অধ্যাপক বিমল শঙ্কর নন্দ। তাঁর ফেসবুক ওয়ালে তিনি যা লিখলেন তা আনএডিটেড তুলে ধরা হল।
তারিখটা সম্ভবত ১৮ই March ১৯৯৮। পরের দিন নতুন মন্ত্রীসভার শপথ। এক বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে বিশিষ্ট সাংবাদিক করণ থাপারের বিষাক্ত গুগলি অবলীলাক্রমে খেলে চলেছেন ধুতি পাঞ্জাবী পরা এক মানুষ। একেবারে নির্লিপ্ত ভঙ্গীতে।সাধারণত রাজনীতিকদের অনেকেই করণ থাপারের মুখোমুখি হতে চাইতেন না। যদি সাক্ষাৎকার দিতেনও, কঠিন প্রশ্ন করলে কখনো এড়িয়ে যেতেন, কখনো বা রেগে যেতেন। সেদিন দেখেছিলাম এই মানুষটি কতটা নির্বিকার। নিজের ওপর কতটা বিশ্বাস। সাক্ষাৎকারের শেষের দিকে করণের প্রশ্ন ছিল ' আপনার সবচেয়ে দুর্বল জায়গা কি '? প্রথমে সহাস্যে পাল্টা প্রশ্ন, 'আমি আমার দুর্বলতা আপনাকে বলবো কেন '? তার পরেই উত্তর ' আমি কাউকে বিলো দ্য বেল্ট আঘাত করতে পারি না। ওটাই আমার দুর্বলতা। আবার ওটাই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি '।
অটল বিহারী বাজপেয়ী। ১৯৫৭ সালে উত্তর প্রদেশের বলরামপুর কেন্দ্র থেকে লোকসভায় নির্বাচিত হওয়ার পর যাঁর ভাষণ শুনে স্বয়ং নেহেরু বলেছিলেন 'রাজনীতিতে এ অনেক দূর উঠবে। একদিন দেশকে নেতৃত্বও দিতে পারে।' প্রধানমন্ত্রী হওয়ার অনেক পরে এক সাক্ষাৎকারে বাজপেয়ী বলেছিলেন ' আমি বরাবর ভাবতাম সাংবাদিক হিসাবেই জীবন কাটাবো কিন্তু রাজনীতিতে আসার পর রাজনীতির বাইরে আর আমার কোন সত্তা নেই। ' মানুষ তাঁকে কিভাবে মনে রাখবে এই প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন 'একজন মানুষ হিসাবে, যে তার নীতি নিয়ে চলতো। যে বদল আনার চেষ্টা করেছিল। যে এই দেশকে, এই পৃথিবীকে আর একটু ভালো জায়গা বানানোর চেষ্টা করেছিল '।
নীতি। কানপুরের ডি. এ. ভি. কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে প্রথম শ্রেণীতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রীধারী অটল বিহারীর কাছে তা কেবল রাজনীতির কোন তত্ত্বকথা ছিলো না। তা ছিল জীবনের এক অংশ। নীতির জন্য সবকিছু ত্যাগ করা যায়। কোন কিছুর বিনিময়ে নীতিকে ত্যাগ করা যায় না।১৯৯৯ সালের ১৭ই এপ্রিল অনাস্থা ভোটে সরকার হেরে যায়। নীতির প্রশ্নে আপস করলে সরকারটা হয়তো টিকে যেত। সে সময় সরকারের অন্যতম শরিক এ আই এ ডি এম কে -এর নেত্রী জয়ললিতার দাবী ছিল তামিলনাড়ুর তৎকালীন করুণানিধির নেতৃত্বাধীন ডি এম কে সরকারকে বরখাস্ত করতে হবে, জয়ললিতার বিরুদ্ধে চলতে থাকা সমস্ত দুর্নীতির মামলা তুলে নিতে হবে। বাজপেয়ী রাজী হন নি। মাত্র ১ ভোটে সরকারের পতন হয়েছিল। কিন্তু জিতেছিলেন বাজপেয়ী। কারন গোটা ভারতে তাঁর ভাবমূর্তি এমন উচ্চতায় পৌঁছেছিল যে পরের নির্বাচনে এন ডি এ বিপুলভাবে ক্ষমতায় ফেরে। প্রসঙ্গত সেই আস্থা ভোটে অংশ নিয়েছিলেন ওড়িশার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী গিরিধারী গোমাংগো যিনি তখনো লোকসভার সদস্যপদে ইস্তফা দেন নি। সারা দেশের মানুষ ছি ছি করলেও কংগ্রেসের মধ্যে এ নিয়ে বিন্দুমাত্র অনুতাপ দেখা যায় নি। আজও কংগ্রেস একে ভুল বলে মানে না। শুধু তাই নয়, বহুজন সমাজ পার্টি আস্থা ভোটের আগে এন ডি এ -কে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও লোকসভার ফ্লোরে বিরুদ্ধে ভোট দেয়। একটু অন্যরকমভাবে চেষ্টা করলে এদের অনেকেরই ভোট পাওয়া যেত। বাজপেয়ী সেই পথে যান নি। ভারতের ইতিহাসে প্রথমবার কোন দল এক ভোটে অনাস্থা প্রস্তাবে হেরেছিল। কিন্তু জিত হয়েছিল বাজপেয়ীর। নৈতিক জয়। হ্যাঁ, একেই বলে নৈতিক জয়।
সংসদীয় গণতন্ত্রে একটা কথা খুবই জনপ্রিয়। Parliament belongs to the opposition. বাজপেয়ীর অসাধারণ বাগ্মিতা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি তাঁকে সংসদীয় গণতন্ত্রে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল। ১৯৭২ সালে ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের সময় সরকারকে সমর্থন করে তাঁর বক্তৃতা , সিমলা চুক্তির বিরোধিতা করে পার্লামেন্টে তাঁর ভাষণ রাজনীতির যে কোন ছাত্রের কাছে শিক্ষণীয়। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য , ১৯৭২ - এ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ওই রকম বিজয় এবং বাংলাদেশের জন্মের পর সিমলা চুক্তি ছিল ইন্দিরা সরকারের পর্বত প্রমাণ ভুল-- যে ভুলের মাসুল এখনো আমরা দিয়ে চলেছি। ঠিক যেমন জওহরলালের ভুল কাশ্মীর ও চীন নীতির শিকার পরবর্তী কালের ভারত। সিমলা চুক্তিতে পাকিস্তানকে হাতের মুঠোয় পেয়েও যে অপ্রয়োজনীয় ছাড় দেওয়া হয়েছিল বাজপেয়ী তার কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। এর গুরুতর পরিণামের সম্ভাবনার কথাও বলেছিলেন। তার অধিকাংশই আজ রূঢ় বাস্তব। ১৯৯৬ সালের ১৩ দিনের সরকার আস্থা ভোটে হেরে যায়। কিন্তু বাজপেয়ীর জবাবী ভাষণটি এখনো অমর হয়ে আছে। আজ বাজপেয়ীর প্রয়াণের পর বিরোধীদের যারা চোখের জলের বন্যা বইয়ে দিচ্ছেন, বাজপেয়ীর প্রধানমন্ত্রীত্ব কালে সংসদের ভিতরে ও বাইরে তারা তাঁকে ছাড়েন নি, তীক্ষ্ণ ব্যক্তিগত আক্রমণও করেছেন। সংসদের আলোচনা যতটুকু প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় পড়েছি বা শুনেছি, বাজপেয়ী কখনো খুব একটা উত্তেজিত হতেন না। পাল্টা কটু কথা কখনো বলেন নি। এদেশে সংসদীয় রাজনীতিকে জনগণের চোখে বৈধতা দানের ক্ষেত্রে বাজপেয়ী সত্যিই এক অন্যতম পুরোধা।
Politics is the last refuse of the scoundrels - এই প্রবাদবাক্য যে সব সময় সত্যি নয় তার প্রমাণ হলেন অটল বিহারী বাজপেয়ী। তিনি ছিলেন সত্যিকারের এক জন মোহিনী নেতা বা charismatic leader. Charisma - এর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বিশিষ্ট সমাজতাত্ত্বিক ম্যাক্স ওয়েবার বলেছেন charisma হল ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের সেই গুণাবলী যা তাঁকে সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা করে রাখে। স্বাধীন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জন মোহিনী নেতার নাম অটল বিহারী বাজপেয়ী।
জননেতার পাশাপাশি রাষ্ট্রনায়ক ও প্রশাসক অটল বিহারীও এক আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব। তবে সেই আলোচনা পরের লেখায়।

No comments

Theme images by caracterdesign. Powered by Blogger.