Header Ads

najarbandi alok somman 2018

লোক ঠকানোর রাজনীতি কবে বন্ধ হবে? পে-কমিশন যেন 'খুড়োর কল'!!

কিংকর অধিকারীঃ আবার রাজ্যের ষষ্ঠ বেতন কমিশনের মেয়াদ ছয় মাস বাড়ানো হল। মনে পড়ে গেল সুকুমার রায়ের গল্পটি। সুকুমার রায়ের 'হযবরল' গল্পে গেছোদাদার সন্ধান কোথায় পাওয়া যাবে- প্রশ্ন করায় বেড়াল বলেছিল,  "মনে কর, তুমি যখন যাবে উলুবেড়ে তার সঙ্গে দেখা করতে, তখন তিনি থাকবেন মতিহারি। যদি মতিহারি যাও, তা হলে শুনবে তিনি আছেন রামকিষ্টপুর। আবার সেখানে গেলে দেখবে তিনি গেছেন কাশিমবাজার। কিছুতেই দেখা হবার জো নেই।” আমাদের রাজ্যে পে-কমিশনের অবস্থাটা হয়েছে সেই গেছোদাদার মতো।
 দীর্ঘদিন থেকে রাজ্য সরকারি কর্মচারী এবং বিদ্যালয় শিক্ষক-শিক্ষিকা-শিক্ষাকর্মীরা ন্যায্য প্রাপ্য ডিএ এবং নতুন পে কমিশনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। ক্ষমতায় আসার আগে সরকারি কর্মচারীদের সমস্ত বকেয়া নিয়মিত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে কি দেখলাম আমরা?২০১৮-এর জানুয়ারী মাস থেকে ১৫% ডিএ দেওয়ার পরেও কেন্দ্রীয় সরকারী কর্মচারীদের তুলনায় বিরাট অঙ্কের ডিএ বাকী থেকে গিয়েছিল। অথচ অধিকাংশ রাজ্য সপ্তম বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী তাদের কর্মীদের বেতন হার ঠিক করেছে। সে তুলনায় এ রাজ্য অনেক পিছিয়ে। বর্তমানে সপ্তম বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের তুলনায় বেসিক এবং ডিএ মিলিয়ে অনেক পিছিয়ে রাজ্য সরকারি কর্মচারীরা। নতুন সংযোজন ডিএ মামলার ফাইল নাকি হারিয়ে ফেলেছে রাজ্য। কোন্ জগতে রয়েছি আমরা?

   সর্বোপরি কেন্দ্রীয় সরকারের সপ্তম পে কমিশনকে সামনে রেখে রাজ্য সরকার ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে অর্থনীতিবিদ অভিরূপ সরকারকে দিয়ে ষষ্ঠ পে কমিশন ঘোষণা করলেন।  যে কমিশনের অফিস খুলতেই লেগে গিয়েছিল কয়েক মাস। সেই সময় বলা হয়েছিল, ছ' মাসের মধ্যে কমিশন তার সুপারিশ সরকারের কাছে জমা দেবে। কিন্তু তারপর তিন দফায় মেয়াদ বৃদ্ধি করা হল যার মেয়াদ শেষ হবে আগামী লোকসভা ভোটের কয়েক মাস আগে ২৬ শে নভেম্বর, ২০১৮। সংবাদ মহল থেকে নেতা মন্ত্রীদের মুখে শোনাই যাচ্ছিল রাজ্যে নতুন পে কমিশন আগামী দুর্গা পূজার সময় কার্যকর হতে চলেছে। সব আশা আকাঙ্খাতে জল ঢেলে দিয়ে ২০১৯ সালের জানুয়ারী মাস থেকে ১৮% ডিএ দেওয়ার কথা ৬ মাস আগেই ঘোষণা করে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী। আবার শোনানো হল ১০% ইন্টারিম লিলিফ সমান ৭% ডিএর গল্প। ১৮% দিয়ে ২৫% এর হিসেব! পে কমিশনের গল্প উচ্চারণও করলেন না! ললিপপ দেখিয়ে এই খুড়োর কতদিন চলবে?
 
  অনেকে বলছেন আসল কারণ নাকি আর্থিক সঙ্কট। সত্যই যদি আর্থিক সঙ্কটের জন্য ডিএ বা পে কমিশন কার্যকর করতে না পেরে থাকেন তাহলে পে-কমিশন গঠন করেছিলেন কেন?

   কেন্দ্রের সপ্তম বেতন কমিশনের রিপোর্টে বলেছে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার জেনারেল ক্যাটাগরি স্টেট। এরা রাজ্যের পে-কমিশনের বাড়তি বোঝা নিতে সক্ষম। বাজেট পাবলিকেশনের সূত্র অনুসারে ২০১১-১২ আর্থিক বর্ষে এই রাজ্যের রেভিনিউ ছিল ২৪,৯৩৮.১৬ কোটি টাকা। ২০১৬-১৭ আর্থিক বর্ষে তা বেড়ে হয়েছে ৫০,২১৯.৩৩ কোটি টাকা।

   গত বছর চতুর্দশ ফিনান্স কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী কেন্দ্রীয় করের অংশ ৩২ শতাংশ থেকে ৪২ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় কর থেকে ১০ শতাংশ বাড়তি অর্থ আদায় হবে। উল্লেখ্য, কেন্দ্রীয় কর হিসাবে ২০১১-১২ সালে রাজ্য পেয়েছিল ১৮৫৮৭.৮১ হাজারকোটি টাকা। ২০১৬-১৭ সালে রাজ্য পাওয়ার কথা ৪২৩১৩.৭৩ হাজার কোটি টাকা। আবার কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে গ্রান্ট-ইন-এইড অর্থ পাওয়ার পরিমাণ ২০১২-১৩ সালে পেয়েছে ১২৩৪২.৮৪ হাজার কোটি টাকা, ২০১৬-১৭ সালে তা বেড়ে দাঁড়ানোর কথা ৩২৭৫৬.৯০ হাজার কোটি টাকা। আর কর্মচারীদের ন্যায্য পাওনা ৫৪ শতাংশ মহার্ঘভাতার অর্থের পরিমাণ যেটা ১ শতাংশ = ২৫ কোটি x ৫৪ = ১৩৫০ কোটি প্রতি মাসে প্রাপ্য, বছরে যা দাঁড়ায় ১৩৫০x ১২= ১৬,২০০ কোটি টাকা। কর্মচারীদের এই টাকা সরকার আত্মসাৎ করে চলেছে। আর সেই অর্থকে কাজে লাগিয়ে ভোট কুড়ানোর রাজনীতি চলছে। ক্ষমতার বাইরে থাকলে প্রতিবাদ আর ক্ষমতায় গেলেই অজুহাত। এই লোক ঠকানোর রাজনীতি কবে বন্ধ হবে?
*লেখকঃ কিংকর অধিকারী, রাজ্য কমিটির যুগ্ম সম্পাদক, শিক্ষক-শিক্ষাকর্মী-শিক্ষানুরাগী ঐক্যমঞ্চ।
Theme images by caracterdesign. Powered by Blogger.