Header Ads

মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষকদের যখন সম্মান দিতে পারেন না তা কেড়ে নেওয়ার অধিকার কে দিয়েছে আপনাকে?

কিংকর অধিকারী: প্রশ্ন আসবে এ বিষয়ে এতদিন পরে কেন লিখছি? কারণ আছে। আশা করেছিলাম বিষয়টি ব্যক্তি ঔদ্ধত্যের বহিঃপ্রকাশ। গুরুত্ব না দেওয়াই ভালো। তা বলে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে অসমর্থনও করিনি। ভেবেছিলাম উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ ধমক দিয়ে এই ব্যক্তি উদ্ধত্যকে সংশোধন করে দেবেন। কিন্তু তা না হওয়ায় বিস্মিত হলাম!
এতক্ষণে হয়ত অনেকেই অনুমান করে ধরে ফেলেছেন- কি বিষয়ে বলছি। হ্যাঁ, আমি শ্রেণিকক্ষে 'চেয়ার বিতর্ক' প্রসঙ্গেই বলছি। বিতর্ক বলাটা ভুল হল, এ নিয়ে কোনো বিতর্ক হতে পারে না। অবাঞ্ছিত একটি নির্দেশিকা বলতে পারি। কোনো শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ এ নিয়ে বিতর্ক করবেন না বা একে সমর্থন করতে পারেন না।

     কোনো শিক্ষক বা শিক্ষিকা যদি তাঁর যথাযথ দায়িত্ব পালন না করে থাকেন তাহলে কি তাঁর চেয়ার কেড়ে নিতে হবে? এ কেমন সংশোধনের রীতি? সমস্ত ডিপার্টমেন্টেই তো কেউ না কেউ অদক্ষ বা কম সংবেদনশীল ব্যক্তি রয়েছেন। তাঁদের জন্যও কি চেয়ার কেড়ে নেবেন? সংশোধনের এই রীতি কি নতুন ভাবে আমদানি হতে চলেছে?

    সম্প্রতি দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার ডি আই বিদ্যালয়গুলির শ্রেণিকক্ষ থেকে শিক্ষক শিক্ষিকা দের জন্য চেয়ার তুলে দেওয়ার ফতোয়া জারি করে জানিয়েছেন, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দাঁড়িয়েই পাঠদান করতে হবে। হঠাৎ কি এমন অসুবিধা হয়ে গেল যে শ্রেণিকক্ষ থেকে চেয়ার তুলে নিতে হবে? শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ কিভাবে পাঠদান করবেন সেটি বিশেষ পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে। মনে রাখবেন, শ্রেণিকক্ষে মাষ্টারমশাই বা দিদিমণিরা সবসময় চেয়ারে বসে থাকেন না। কখনো ব্ল্যাকবোর্ড ওয়ার্ক, কখনো ক্লাস ওয়ার্ক প্রদান আবার কখনো বা ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে পড়া নেওয়া বা পড়া ধরার সময় রুমের মধ্যে বিচরণ করতে থাকেন। কখনো চেয়ার বা টেবিলে বসেও পাঠদান করেন। আবার শারিরীক ভাবে অক্ষম বা অসুস্থতাজনিত কারণে অনেককে চেয়ার ব্যবহার করতেই হয়।
 
  একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ ঠিকমতো পাঠদান করছেন কিনা তা দেখভালের জন্য তো বিদ্যালয় পরিদর্শনের ব্যবস্থা রয়েছে। যে ডিআই দপ্তর থেকে এই ধরনের নির্দেশিকা জারি করা হচ্ছে সেই দপ্তর তার দায়িত্ব কতখানি পালন করছে? ছোটবেলায় আমরা দেখতাম প্রায়ই বিদ্যালয় ইন্সপেকশন হত। তাতে স্কুলে স্কুলে একটা অন্যরকম সাড়া পড়ে যেত। সমস্ত পরিচালন ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একটা তৎপরতা দেখা যেত। আজ সে কাজ প্রায় বন্ধই হয়ে আছে। কেন? তার জবাব কে দেবে? বরং ঐ অফিসগুলির মধ্যে সবাই না হলেও অনেকেই অসৎ কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। অনেক দাপুটে প্রধান শিক্ষককেও দেখেছি কি করুণ দৃষ্টিতে তাদের দয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে! একটা কাজ হাসিল করতে অনেক সময় বাধ্য করা হয় অনৈতিক সমঝোতা করতে। আর তাঁরাই যখন বিদ্যালয়ে নৈতিকতা বা দায়িত্বের কথা তুলে ধরেন তা কি শিক্ষক সমাজের কাছে সম্মানীয় নজির গড়ে তুলতে পারে?
       মনে রাখবেন, চেয়ার কেবলমাত্র একটি বসবার জায়গা নয়। এর সাথে জড়িয়ে আছে মর্যাদার প্রশ্ন। শিক্ষকদের মর্যাদা কেড়ে নিয়ে সমাজে কাকে শিক্ষিত করার ডাক দিতে চাইছেন এই আধিকারিকরা? একজন বিশেষ  ডি আই এই অধিকার পেলেন কোথা থেকে? এ ব্যাপারে শিক্ষামন্ত্রীই বা নিশ্চুপ কেন? তাহলে কি প্রচ্ছন্ন হলেও সম্মতি তাঁরও রয়েছে? শিক্ষকদের যদি এই অসম্মানের জায়গায় ঠেলে দেওয়া হয় তাহলে অদূর ভবিষ্যতে আজ যাঁরা সম্মানের সঙ্গে ঐ স্থানটি দখল করে বসে আছেন তাঁদের চেয়ারটারও টান পড়বে। যে সমাজ ছেলে মেয়ে বা ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে পিতা-মাতা বা শিক্ষক-শিক্ষিকা বা গুরুজনদের মর্যাদাহানি করতে শেখায় সে সমাজ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছ থেকে বড় কিছু আশা করতে পারে কি?
     শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ চেয়ার ব্যবহার করুন বা না করুন শ্রেণিকক্ষ থেকে চেয়ার সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত সমগ্র শিক্ষক সমাজ কে অসম্মান করার একটি হীন ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই না। এ কেবলমাত্র সরকারি তরফ থেকে অসম্মান নয়, শ্রেণিকক্ষে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছেও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অসম্মানিত ও হেয় প্রতিপন্ন করার এটি একটি হীন প্রয়াস। ছাত্র ছাত্রীরা যদি শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সম্মান করতে না শেখে তাহলে সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থা অচিরেই ভেঙে পড়বে । শিক্ষাব্যবস্থাকে সে দিকেই ঠেলে দেওয়া হচ্ছে না কি?
      সারা রাজ্য জুড়ে বিদ্যালয়ে বিদ্যালয়ে বহু শিক্ষক-শিক্ষিকার পদ শূন্য, সামগ্রিক পরিকাঠামোর অভাব এবং শিক্ষা বহির্ভূত হাজার রকমের দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে বিদ্যালয় গুলির উপর। সর্বোপরি বিদ্যালয়গুলিতে রাজনৈতিক দাদাগিরি শিক্ষার পরিবেশকে কলুষিত করছে । সেদিকে নজর না দিয়ে শিক্ষক শিক্ষিকাদের উপর একটার পর একটা ফতোয়া জারি করা হচ্ছে। জেলায় জেলায় ডি আই অফিসগুলি দুর্নীতির আঁতুর ঘরে পরিণত হয়েছে । সেগুলি সংশোধনের কোন চেষ্টা নেই । অথচ সেই দুর্নীতির চেয়ারে বসে তাঁরাই ফতোয়া জারি করে চলেছেন। এর চেয়ে লজ্জার আর কি হতে পারে! নিরপরাধ শিক্ষক-শিক্ষিকাদের উপর দোষ চাপিয়ে দিয়ে নিজেদের হাজার দোষ ঢাকার এ এক অভিনব কৌশল ছাড়া আর কিছুই না। সম্মান যখন দিতে পারেন না তাকে কেড়ে নেওয়ার অধিকার আপনার নেই।
লেখক: রাজ্য কমিটির যুগ্ম সম্পাদক, শিক্ষক-শিক্ষাকর্মী-শিক্ষানুরাগী ঐক্যমঞ্চ। 

Theme images by caracterdesign. Powered by Blogger.